1. admin@protidinshikhsha.com : protidinshiksha.com :
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৪৬ অপরাহ্ন

সুস্বাস্থ্যের জন্য কিছু গ্রামীণ সবজি

  • প্রকাশিত মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২০
  • ১০২ বার পড়া হয়েছে

বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সুনাগরিক প্রয়োজন। সুনাগরিক হতে হলে স্বাস্থ্যবান হতে হবে, সুস্থ চিন্তা করতে হবে এবং সুকর্ম করতে হবে। স্বাস্থ্যবান থাকা বা সুস্থ চিন্তা এসবের জন্য মূলত অবদান থাকে খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা ও পরিবেশের। একটা শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের সময় হলো ৫ বছর বয়স পর্যন্ত। এই সময়ে যদি শিশুদের সঠিক পরিমাণে পুষ্টি সমৃদ্ধ/সুষম খাবার না দেয়া হয় তবে পুষ্টি ঘাটতির ফলে কম মেধা নিয়ে তারা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে আমাদের পরিবার বা জাতীয় পর্যায়ে তার অবদান রাখার ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ সুনাগরিক হতে সুষম খাবার গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে খাবার হওয়া চাই নিরাপদ। খাবারের জোগান দিচ্ছে আমাদের কৃষক এবং কৃষি। এজন্যই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মানসম্পন্ন কৃষি পণ্য উৎপাদনের জন্য কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার ১ম বৈঠকই তিনি কৃষি পণ্য উৎপাদনে সুষম সারের ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকা সারের মূল্য ক্রয়ক্ষমতা মধ্যে ও হাতের নাগালের নিয়ে এসেছেন। সুষম সারের ব্যবহার যেন আরও বেশি হয় সেজন্য এ বছর বিজয়ের মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের অনুসৃত নীতি ও মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক মহোদয়ের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ডিএপি সারের দাম আরও একধাপ কমিয়ে আনা হয়। সরকার এ নিয়ে পাঁচ দফায় সারের মূল্য কমালো। সারে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে ৮০ টাকার টিএসপি সার ২২ টাকা, ৭০ টাকার এমওপি ১৫ টাকা ও ৯০ টাকার ডিএপি ১৬ টাকায় নির্ধারণ করায় কৃষকগণ তাদের ফসল ক্ষেতে সুষম সার প্রয়োগ করতে পারছে।

বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব এবং সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী একজন কৃষি বিজ্ঞানী। মন্ত্রী মহোদয় জানেন নিরাপদ কৃষি পণ্য উৎপাদনের প্রথম শর্তই হলো কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণগুলো মাটি, মানব স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য নিরাপদ হয়। সারের দাম বেশি হলে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেজাল ও নিম্নমানের সার কমদামে দরিদ্র কৃষকদের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করে। ভেজাল সার ব্যবহারের ফলে সুষম পুষ্টির অভাবে ফসল তার শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যার জন্য বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়। এগুলো ঠেকাতে কৃষকগণ আবার অধিক পরিমাণে রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এতে একদিকে মাটি, মানব ও প্রাণিস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সবই হুমকির মুখে পড়ে। অন্যদিকে কৃষি পণ্য বিশেষত শাকসবজি গ্রহণ আর নিরাপদ থাকে না। অনেক ভোক্তা না জেনে এই ধরনের সবজি খেয়ে বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগতে থাকে আবার অনেকে শাকসবজিতে অনিয়ন্ত্রিত বালাইনাশক ব্যবহারের কথা ভেবে এগুলো না খেয়ে পুষ্টিহীনতায় ভুগতে থাকেন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশের শতকরা ৭০ ভাগ পুরুষ এবং ৭৫ ভাগ মহিলা আয়রন স্বল্পতায় ভুগছে। ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি ৮৮% পরিবারে এবং ভিটামিন ‘সি’ এর ঘাটতি ৯০% পরিবারে বিদ্যমান। মহিলাদের মধ্যে জিংক স্বল্পতা ৫৭.৩% এবং ৫ বছরের নিচের শিশুদের জিংক স্বল্পতা ৪৪%। এভাবে সকল প্রকার ভিটামিনেরই ঘাটতির চিত্র আছে। খর্বকায় শিশুর হার এখনও ৩১% এবং কৃশকায় শিশুর হারও ১৪%। ধারাবাহিকভাবে তীব্র অপুষ্টির শিকার হলে বয়সের তুলনায় শিশুরা খর্বকায় হয়। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা নয়। দেশে যথেষ্ট পরিমাণে বিভিন্ন রকম শাকসবজি ও ফলমূলের সরবরাহ আছে। যা দ্বারা সকল প্রকার পুষ্টি উপাদান পাওয়া সম্ভব। কিন্তু শাকসবজি ও ফলমূল নিরাপদ না থাকায় মানুষ গ্রহণ করছে না। যে কারণে এখন সময় এসেছে নিরাপদ ফসল উৎপাদন জোর দেয়ার এবং পুষ্টি বিবেচনা করে খাদ্য গ্রহণ করার। শুধুমাত্র ভাত আর যে কোনো ধরনের একটি তরকারি হলেই আমরা খুশি। এই মানসিকতায় আমরা আজ পুষ্টিহীনতার শিকার এবং অতিরিক্ত কার্বহাইড্রেট জাতীয় খাবার গ্রহণের কারণে আমরা স্থূলকায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছি। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগী এখন শতকরা ৭.৯ এবং স্থূলকায় মানুষের সংখ্যা শতকরা ৩৯ ভাগ। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ‘মায়ের পুষ্টি শিশুর তুষ্টি’। অর্থাৎ সুস্থ ও স্বাস্থ্যবতী মা-ই কেবলমাত্র স্বাস্থ্যবান সন্তানের জন্ম দিতে পারে। পুষ্টিহীন মায়ের সন্তানের জন্মকালীন ওজন কম এবং অসুস্থ, হাবাগোবা, রুগ্ণ হয়ে জন্মায়। পরে নানা রোগে ভোগে। প্রসূতি মায়েদেরও নানা রকম জটিলতা দেখা যায়। গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী অবস্থায় মায়েদের খাবারের প্রয়োজন সাধারণ অবস্থার চেয়ে বেশি থাকে। এ সময় প্রয়োজন অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম ও আয়রন, জিংকসমৃদ্ধ খাবার খেতে হয়। অনেক সময় পুষ্টি সম্পর্কে ধারণা না থাকার ফলে পুষ্টির অভাবে নিজের চাহিদার ঘাটতির সঙ্গে সন্তানও পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ঘাটতি নিয়ে জন্মায়। মাকে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন রঙিন শাকসবজি, ফল, টকজাতীয় ফল, পানি ও পানিজাতীয় খাবার প্রয়োজন অনুযায়ী খেতে হয়।

আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। শিশুর জন্য জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধই যথেষ্ট এবং ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার দিতে হবে। সেই সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে খাদ্য পরিবেশন করা হয়। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু, মা ও বৃদ্ধরা পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি না ঘটার কারণে আত্মকেন্দ্রিকতা, অবসাদ, ব্যক্তিত্বহীনতা দেখা যায় এবং মেধাশক্তি বিকশিত হতে পারে না। ফলে এসব ছেলেমেয়ে অলস ও উদাসীন, পরনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে। যদি শিশুদের সঠিক পরিমাণে সুষম খাবার না দেয়া হয় তবে পুষ্টি ঘাটতির ফলে কম মেধা নিয়ে তারা গড়ে উঠে। পরবর্তীতে আমাদের পরিবার বা জাতীয় পর্যায়ে তার অবদান কমে যায়। এই ঘাটতি কিন্তু আজও আমরা বয়ে চলেছি। এ থেকে উত্তোরণের একমাত্র উপায় হলো জাতিকে পুষ্টি শিক্ষাসহ সুশিক্ষিত করা। আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদনের সাথে নিয়োজিত শ্রম শক্তি এখনও ৪০.৬%। এই ৪০% জনশক্তি, গ্রামীণ মহিলা এবং স্কুলের শিক্ষার্থীদের যদি সঠিকভাবে পুষ্টিশিক্ষা দেয়া যায় তবে আমাদের দেশের জনগণের পুষ্টিহীনতা দূর হতে বেশি সময় লাগবে না। স্কুল প্রাঙ্গণে শাকসবজি, ফলচাষের প্রদর্শনী দিয়ে শিক্ষক ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পুষ্টিশিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করা যায়। বসতবাড়ির আঙিনায় শাকসবজির চাষ ও পুষ্টি জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে মহিলাদের তথা পরিবারের সব সদস্যদের সম্পৃক্ত করা যায়। এ ছাড়াও শহর এলাকায় বাড়ির ছাদ উপযোগী শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদনে পরিবারের সকলকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা যায়।

খাদ্য ও পুষ্টিবিদদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির পুষ্টির চাহিদা তার দৈনিক পরিশ্রম, দেহের ওজন ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। পুষ্টি গবেষকদের মতে, একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির জন্য খাবার তালিকায় থাকা উচিত চাল ৩০০-৪০০ গ্রাম, আটা ১৫০ গ্রাম, ডাল ৫০-৬০ গ্রাম (কাঁচা), মাছ/মাংস/ডিম ৭০-১০০ গ্রাম, শাক ১০০ গ্রাম, অন্যান্য সবজি ১০০ গ্রাম, আলু ৮০-১০০ গ্রাম, ফল ১৫০-২০০ গ্রাম, তেল ৪০ গ্রাম, চিনি/গুড়/মিষ্টি ৩০ গ্রাম। পুষ্টিবিদরা সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন সুষম খাবার গ্রহণের কথা বলেন। সুষম খাদ্যের অর্থই হলো দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতি বেলায় খাদ্যের প্রত্যেকটি উপাদান খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। এই তালিকায় দেখা যাচ্ছে শাকসবজির পরিমাণ কিন্তু সবার জন্য নির্ধারিত।

শাকসবজি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো কিন্তু সচরাচর আমরা যেসব শাকসবজি খাচ্ছি তা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভালো আর কতটা নিরাপদ? কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ছাড়াই অনেকে শাকসবজি উৎপাদনে ক্ষতিকর মাত্রায় রাসায়নিক বালাইনাশক ও রাসায়নিক সার যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করেন। ফসল সংগ্রহোত্তর সঠিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন না করায় বাড়ছে শাকসবজি সংগ্রহের পর তাতে বিভিন্ন জীবাণুর উপস্থিতি ও পচন। শাকসবজি পরিষ্কার করার জন্যও অনেক সময় ব্যবহৃত হচ্ছে দূষিত পানি। বিভিন্ন পর্যায়ে শাকসবজি গ্রহণ তাই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

অনেকে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদের কথা বলেন। তবে মনে রাখা দরকার যে, নিরাপদ শাকসবজি মানে শুধু জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা শাকসবজিকে বুঝায় না। জৈব শাকসবজিও ক্ষেত থেকে তোলার পর খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত নানাভাবে অনিরাপদ হতে পারে।

বিগত এক দশকে দেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে অভাবনীয় সফলতার সাথে সাথে কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে এবং দানাজাতীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতোমধ্যে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে এগিয়ে গেলেও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনে এখনো অনেক পিছিয়ে। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। পুষ্টি নিরাপত্তা ব্যতীত খাদ্য নিরাপত্তা সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ২০৩০ এর অন্যতম উদ্দেশ্য হল টেকসই কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন। এদেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পরিমিত পরিমাণ সবজি ও ফল খাওয়ার কোনো বিকল্প নাই। এজন্য দরকার বসতবাড়ি আঙিনায় সারাবছর সবজি ও ফলের চাষ বৃদ্ধি করা। বছরব্যাপী সবজি ও ফল চাষ পারিবারিক পুষ্টি চাহিদার পাশাপাশি দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়ক হবে। এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এক বিরাট সমস্যা পুষ্টি ঘাটতি। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও খাদ্য তালিকায় রকমারি ফল ও সবজি জাতীয় খাবারের ব্যবহার। শাকসবজি ও ফলমূলের পারিবারিক চাহিদা মেটাতে খুব একটা বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। আমাদের বাড়ির আনাচে কানাচে পড়ে থাকা জমিগুলো পরিকল্পিতভাবে পুষ্টিসমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফল চাষের আওতায় আনা হলে তা থেকে সারা বছর পরিবারের সবার চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অপুষ্টিজনিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষি ক্ষেত্রে সরকারি কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলেই পুষ্টিকর খাদ্য জোগানের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত জনপদ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সম্প্রসারণকর্মী ও প্রশাসনিক সঠিক পদক্ষেপ নিলে কি লাভ হতে পারে আমরা আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেখেছি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে (Good Agriculture Practices) সম্প্রসারণের ফলে কম দামে সঠিক স্বাদযুক্ত আম দরিদ্র মানুষসহ আমরা সবাই এখন খেতে পারছি। কিন্তু শাকসবজির যথেষ্ট উৎপাদন থাকার পরও অনেক মানুষ তা খেতে কুণ্ঠাবোধ করে, তার কারণ নির্বিচারে বালাইনাশকের ব্যবহার। এখানে আমাদের যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হবে। শিশুরা, মায়েরাসহ সকল মানুষ পুষ্টিতে বলীয়ান হতে পারলে প্রত্যেকের লাভ, সমাজের লাভ, দেশ ও জাতীয় লাভ। সুতরাং আমরা যদি যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি তবে আমরা সকলেই লাভবান হবো এবং দেশও লাভবান হবে।

কৃষি ক্ষেত্রে সবজি চাষে বালাই ব্যবস্থাপনায় শুধুমাত্র বালাইনাশকের ওপর নির্ভরশীলতা যেমন ব্যয়বহুল তেমনি পরিবেশের জন্য দূষণীয় ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ কারণে পরিবেশবান্ধব উপায়ে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে কৃষকদের সক্ষম করে তোলা এবং কৃষকদের আর্থিক অবস্থার টেকসই উন্নয়ন ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করার লক্ষ্য নিরাপদ সবজি উৎপাদনের এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্যগুলো হলো- কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি উৎপাদনে কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; পরিবেশের কোনরূপ ক্ষতি না করে সবজির স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সবজি রপ্তানিতে সহায়তা করা; টেকসই ও পরিবেশ সম্মত উপায়ে কৃষকের সবজি উৎপাদন এবং আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করা; মানসম্মত সবজি উৎপাদনের জন্য জৈব কৃষি কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং নিরাপদ সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করা। এর ফলে ‘নিরাপদ সবজি উৎপাদন’ কার্যক্রম জোরদার করায় কৃষকের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন করে মাটিতে প্রয়োগ করায় রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে ও মাটির স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। পোকা দমনে জৈব বালাইনাশক ও সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের ফলে কীটনাশকের ব্যবহার এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস অথবা অনেক ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না বিধায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা পাবে এবং সর্বোপরি কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি কৃষকের টেকসই উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মান উন্নীত হবে। ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর হতে ৩২টি জৈব বালাইনাশকের নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলার দুটি গ্রাম নিরাপদ পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদনে মডেল ইউনিয়ন স্থাপন বাস্তবায়নের কার্যক্রম চালু হয়েছে। এতে ফসলের পোকা দমনে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, হলুদ, সাদা ও আঠালো ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক। এ পদ্ধতিতে কীটনাশক খরচ না থাকায় সবজির উৎপাদন খরচ কম হয়, কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসসহ উৎপাদিত সবজি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ হবে এবং কৃষকগণ সঠিক বাজারমূল্য পাবেন বলে আমরা আশাবাদী। এলাকার কৃষকগণ তাদের উৎপাদিত নিরাপদ সবজি যাতে সরাসরি ভোক্তাদের হাতে তুলে দিতে পারে এজন্য ঢাকাসহ, সারাদেশের জেলা ও উপজেলা সদরে চালু হচ্ছে সাপ্তাহিক কৃষকের বাজার। যেখান থেকে ভোক্তাগণ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনতে পারবেন নিরাপদ সবজি। নিরাপদ সবজি পূরণ করবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা। দেশ ও জাতি পাবে স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী সুনাগরিক।

কৃষিবিদ ড. মোঃ আবদুল মুঈদ

মহাপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা, ফোন-৯১৪০৮৫০, ই- মেইল : dg@dae.gov.bd

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
২০২০ প্রতিদিন শিক্ষা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রযুক্তি সহায়তায় মাল্টিকেয়ার

প্রযুক্তি সহায়তায় মাল্টিকেয়ার